SkyIsTheLimit
Bookmark

রচনা সভ্যতা

আধুনিক সভ্যতা  
বা মানব জীবনে সভ্যতা
বা সভ্যতা ও আজকের পৃথিবী
ভূমিকা : সভ্যতা শব্দটির আভিধানিক অর্থ ভদ্রতা ও শিষ্টতা। ইংরেজিতে সভ্যতার প্রতিশব্দ হল 'Civilization'. সভ্যতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক ম্যাকাইভার ও পেজ বলেছেন, “সভ্যতা অর্থে আমরা বুঝি মানুষ তার জীবনধারণের জন্যে যে যান্ত্রিক ব্যবস্থা, কলাকৌশল ও সংগঠন সৃষ্টি করেছে, তারই সামগ্রিক রূপ।” অর্থাৎ, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষ যে উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি করে তাকে সভ্যতা বলা যায়। আরও সংক্ষেপে বলতে গেলে, মানুষের বর্বরােচিত স্বভাবকে পরিশীলিত করার নামই সভ্যতা।
সভ্যতার সূচনা : পৃথিবীতে সভ্যতার সূচনা কখন হয়েছিল এবং কোন্ দেশে কোন্ মানুষটি সর্বপ্রথম সভ্যতার আলোকে গড়ে উঠেছিল তার কোন নির্ভরযােগ্য ইতিহাস নেই। তবে এটা সত্য যে, মানুষ এক ধরনের প্রাণী হওয়ার পরও তার মধ্যে একটা গুণ আছে, ইংরেজিতে যাকে বলে 'Rationality'; বাংলায় যাকে বলে মানসসত্তা’, তার চর্চার মাধ্যমে মানুষ প্রাণিত্বকে জয় করতে পেরেছে। মানুষের রক্ত, মাংস, ঈর্ষা, ঘৃণা ইত্যাদি অন্যান্য প্রাণীর মত হলেও মানুষ এ প্রবৃত্তিগুলােকে জয় করে মানুষে মানুষে মৈত্রী, জীব এবং জড় প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব বিস্তার করে এক বৃহৎ মানবসমাজের কল্যাণের জন্যে জীবন পরিবেশ গড়ে তুলেছে; আর এটাই হল সভ্যতার মূল ভিত্তি। এক সময় ছিল, যখন পৃথিবীর মানুষ হাসতে জানত না, ভালােবাসতে জানত না, ভাষার মাধ্যমে কথা বলতে পারত না। মানুষ তখন সময় কাটাত সংকীর্ণ স্বার্থপরতার গণ্ডিতে আবদ্ধ নােংরা। পরিবেশে। তখন ছিল আদিম পৃথিবী। তারপর ক্রমে ক্রমে মানুষ একদিন হাসতে শিখল, একে অপরকে ভালােবাসতে শিখল, দলবদ্ধ হয়ে কোথাও বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠল, পাথরের সাহায্য বন্যপ্রাণী শিকার করে এক ধরনের খাওয়ার পদ্ধতি শিখল। মানুষের এ অবস্থাকেও কিছুটা সভ্য হওয়া বলা যায়। ইতিহাসে এর নাম প্রস্তর যুগ। অবশ্য বর্তমান সভ্যতার মাপকাঠিতে সে অবস্থার মান ছিল অনেক নিচে। তবু ইতিহাসের বিচারে প্রস্তর যুগ থেকেই মানবজীবনে সভ্যতার সূত্রপাত ঘটে। পরে তা এগিয়ে যায় অগ্রগতির দিকে।
কতিপয় সভ্যতার বিবরণ : সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে সভ্যতারও পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গড়ে উঠে আদি স্তরের প্রাচীন অস্ট্রিক সভ্যতা, সেমিটিক সভ্যতা, ব্যবিলনীয় সভ্যতা, অ্যাসিরীয় সভ্যতা, ভারতীয় সভ্যতা ইত্যাদি। বর্তমান পৃথিবী সুসভ্যতার অন্যতম নিদর্শন। বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে বৈজ্ঞানিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। রাশিয়া, আমেরিকা, বৃটেন, জার্মানি, চীন, জাপান প্রভৃতি দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শীর্ষে আরােহণ করেছে। আধুনিক সভ্যতার বিকাশে বিজ্ঞানের অবদান সবচেয়ে বেশি।
সভ্যতার বিবর্তনে মানুষের অগ্রগতি : পৃথিবীর আদি বা প্রাচীন সভ্যতা ছিল একান্তই কৃষির উপর নির্ভরশীল। নদীবাহিত পললে গঠিত সমভূমিতে আদি যাযাবর জাতি প্রথম বসতি স্থাপন করে। তাদের জীবন জীবিকানির্বাহের একমাত্র ব্যবস্থা ছিল পশুপালন আর কৃষিভিত্তিক। তাই বিশ্বের কৃষিভিত্তিক প্রাচীন সভ্যতাগুলাে নদনদী অধ্যুষিত অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। যেমন মিশরীয় সভ্যতা নীল নদের তীরে ও ভারতীয় সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। তারপর ক্রমে ক্রমে মানুষ তাম, লৌহ, ইস্পাত ইত্যাদি ধাতুর ব্যবহার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করে। এসব ধাতুর ব্যবহার সভ্যতার দ্বিতীয় স্তরের উত্তরণকে সম্ভব করে তুলেছে। সভ্যতার বিকাশের পথ ধরে সভ্যতা বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে মানুষের অগ্রগতিকে। ফলে মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতি সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে। এক সময়ের গুহাবাসী মানুষ তার রুচিবােধ, সৌন্দর্যজ্ঞান ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাহায্যে সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করতে শিখেছে। জীবন চলার ক্ষেত্রে প্রয়ােজনীয় দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করে সাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে নিয়েছে। এভাবেই মানুষের প্রচেষ্টার ফলে বিজ্ঞান সভ্যতার চরম শিখরে আরােহণ করতে সক্ষম হয়েছে। এসেছে মানুষ এবং পৃথিবীর পরিবর্তন। পরিবর্তিত হয়েছে মানুষের ভাষা, রুচি, সৌন্দর্য, মানুষে মানুষে সম্পর্ক, বােধ, বুদ্ধি, অনুভূতি ইত্যাদি। এর সবগুলােই আধুনিক সভ্যতার প্রতীক। এজন্যে বলা হয়, বিজ্ঞান ও আধুনিক জীবন একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞান ও আধুনিক জীবন অকল্পনীয়। বিজ্ঞান আজ আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের অস্তিত্বকে কল্যাণকর স্পর্শে সজীব করে তুলেছে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পটভূমিতে নতুন ধ্যানধারণার প্রবর্তন আধুনিক জীবনের বিজ্ঞান বিজ্ঞানমনস্ক পদক্ষেপের জন্যই সম্ভব হয়েছে। মানুষের সাথে মানুষের অখণ্ড প্রীতি, হৃদয়ে হৃদয়ে ভালোবাসা, দেশে দেশে সাহিত্য সংস্কৃতির বিস্তার ও প্রসারের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করাই হল সভ্যতার অন্যতম লক্ষ্য। তাই মানুষের বৈজ্ঞানিক চেতনা ও বুদ্ধিকে প্রতিযােগিতামূলক অহমিকার পথে পরিচালিত না করে সুন্দর সভ্যতার অগ্রগতিকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজে লাগাতে হবে। তাহলেই সভ্যতার ক্রমবিকাশ অব্যাহত থাকবে। 
উপসংহার : আজকের সভ্যতা একদিনে গড়ে উঠেনি। এর পেছনে রয়ে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের নিরলস প্রচেষ্টা। এর পেছনে রয়েছে শ্রম আর প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা। তাই পৃথিবী ও মানুষের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করতে পারে এমন কোন অশুভ চেষ্টা থেকে সভ্যতার গতিধারাকে রক্ষা করতে হবে। মনে রাখা প্রয়ােজন যে, কল্যাণধর্মিতা আর সভ্যতা এক জিনিস নয়। কল্যাণের জন্যে রক্তপাত ঘটানাে হয়তবা সমর্থনযােগ্য, কিন্তু সভ্যতা কখনােই নিষ্ঠুরতা ও রক্তপাত ঘটানাের বিষয়টিকে প্রশ্রয় দেয় না বা সমর্থন করে না।

লেখা-লেখি করতে ভালোবাসেন? লেখালেখির মাধ্যমে উপার্জন করতে যুক্ত হতে পারেন আমাদের সাথে Telegram এ!
Post a Comment

Post a Comment