বাংলাদেশের বৃহত্তম শিক্ষামূলক কমিউনিটিতে আপনাকে স্বাগতম!

অধ্যবসায় রচনা


ভূমিকাঃ মানুষ মাত্রই মরণশীল । পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করলে তাকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয় । মৃত্যুর মধ্য দিয়েই পৃথিবী থেকে তার নাম মুছে যায় কিন্তু এরই মাঝে কেউ কেউ নিজ কৃতকর্ম দ্বারা পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকে । কাজের প্রতি নিষ্ঠা, একাগ্রতা, ধৈর্য ও পরিশ্রমের ফলেই পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করা যায় । সফলতার দ্বারে । পৌছাবার জন্য একাগ্রতা, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের মহান প্রচেষ্টাই অধ্যবসায় ।

অধ্যবসায় কীঃ কোন কাজে সফলতা লাভের জন্য বারবার চেষ্টা করার নামই অধ্যবসায় । অধ্যবসায় মানব চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি গুণ । কোন কাজে সফল হবার লক্ষে কাজে আত্মনিয়োগ, উদ্যোগ, পরিশ্রম, আন্তরিকতা, মনবল, ধৈর্য প্রভৃতি গুণ একত্রিত হয়েই অধ্যবসায়ের পুরিপূর্ণ রূপ সৃষ্টি হয় । সফলতার স্বপ্নকুসুম প্রস্ফুটিত করতে তাই অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই ।

অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তাঃ জীবনে প্রতিটি পর্যায়ে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম । মানব জীবন সুন্দর সুসজ্জিত কোন পুষ্পশয্যা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই হচ্ছে কমবেশি দ্বন্দ্বমুখর ও কণ্টকাকীর্ণ । এই কণ্টকময় জীবনে নিজের অসিত্মত্বকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রাণপণে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় । সৃষ্টিকর্তা মানুষকে প্রতিভা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন । এ কথা সত্য, তবে প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে আর এ জন্য প্রয়োজনীয়তা অধ্যবসায় । অধ্যবসায় ব্যতীত সকল প্রতিভা অসিত্মত্বহীন হয়ে পড়ে । কিন্তু প্রতিভার দোহাই দিয়ে বিনা পরিশ্রমে যারা সফল হতে চায় তারা কাপুরুষ হিসেবেই নিজেকে অন্যের কাছে তুলে ধরে । আবার যারা একবার ব্যর্থ হয়ে যারা পিছিয়ে পড়ে তারাও সাফল্যের সূর্যকে স্পর্শ করতে পারে না । ব্যর্থতাই সাফল্যের সাপোন' কথার্টি মনে রেখে যদি নিষ্ঠার সঙ্গে পরিশ্রম করা যায়, তবে সাফল্য আসবেই নিশ্চিত । তাই তো কবি কালিপ্রসন্ন ঘোষ বলেছেন-

"পারিব না এ কথাটি বলিও না আর
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার
পাঁচ জনে পারে যাহা,
তুমিও পারিবে তাহা
পার কি না পার কর যতন আবার ।
একবার না পারিলে দেখ শতবার । "

ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলে কণ্টকপূর্ণ জীবনকে ভয় না পেয়ে অধ্যবসায়ের সঙ্গে এগিয়ে গেলে জীবনে সাফল্য অনিবার্য ।

অধ্যবসায় ও প্রতিভাঃ অনেকেই মনে করেন, অসাধারণ প্রতিভা ছাড়া কোন কাজে সফলতা আসে না । কিন্তু অধ্যবসায় ও পরিশ্রম ছাড়া শুধু প্রতিভায় কোন কাজ হয় না । এ প্রসঙ্গে মহাবিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন বলেছেন । আমার আবিষ্কারের কারণ প্রতিভা নয়, বহু বছরের চিন্তাশীলতা ও পরিশ্রমের ফলে দূরূহ তত্ত্বগুলোর রহস্য আমি ধরতে পেরেছি । অস্পষ্টতা থেকে ধীরে ধীরে আমি স্পষ্টতার দিকে উপস্তি হয়েছি ।' দার্শনিক ভলটেয়ার বলেছেন, প্রতিভা বলে কিছু নেই । পরিশ্রম ও সাধনা করে যাও, তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে । অধ্যবসায় সম্পর্কে ভালটন বলেছেন, 'লোকে আমাকে প্রতিভাবান বলে কিন্তু আমি পরিশ্রম ছাড়া আর কিছুই জানি না ।' প্রকৃতপক্ষে প্রতিভাকে অধ্যবসায়ের গুণে কাজে লাগাতে না পারলে জগতে কোন কল্যাণই আসে না । প্রতিভা আল্লাহর দান কিন্তু অধ্যবসায় ছাড়া প্রতিভার বিকাশ ঘটে না ।

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ঃ মানব জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হচ্ছে ছাত্রজীবন । এ সময়ের ভুল সিদ্ধান্ত, গাফলতি কিংবা অলসতা সারা জীবনকে পঙ্গু করে দেয়, তাই এ সময়ে অধ্যবসায়ের একান্ত প্রয়োজন রয়েছে । অলস ও শ্রমবিমুখ ব্যক্তি কখনও বিদ্যালাভ করতে পারে না । আবার অল্প মেধাশক্তি সম্পন্ন ছাত্রও অধ্যবসায়ী হলে সফলতা লাভ করতে পারে । কোনো ছাত্র একবার অকৃতকার্য হলে অনেক সময় পরিবার থেকে ভৎর্সনা শুনতে হয় । তাই তাকে উদ্যম ও পরিশ্রম করে পড়াশোনা করতে হবে তবেই সাফল্য আসবে । অধ্যবসায়ী ছাত্রই পারে সকল ব্যর্থতাকে ঝেড়ে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে । এ সত্য উপলব্ধি করেই কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন‘কেন পামক্ষান্ত হও, হেরি দীর্ঘপথ উদ্যম বিহনে কার পুরে মনােরথ?”

ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্বঃ ব্যক্তিজীবনে কর্ম ক্ষেত্রেও অধ্যবসায়ের প্রয়ােজনীয়তা অনস্বীকার্য । সকল মানুষের শক্তি বা ক্ষমতা এক রকম নয় কিন্তু প্রত্যেকেই চায় সুন্দর, উন্নত জীবন । এ ক্ষেত্রে যদি অধ্যবসায়ের যথার্থ প্রয়ােগ করা যায় শক্তি বা ক্ষমতার স্বল্পতা সত্ত্বেও সাফল্যের স্বাদ পাওয়া সম্ভব । কাজের আগ্রহ, কাজের প্রতি শ্রদ্ধা, বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে, সুদৃঢ় সংকল্প থাকলে কোন ব্যক্তিই কোন কাজে ব্যর্থ হয় না । জীবনে চলার পথ যেহেতু মসৃণ নয় তাই স্বপ্নের উন্নত ও সুন্দর জীবন লাভ করতে হলে অবশ্যই অধ্যবসায়ী হতে হবে ।

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়ােজনীয়তাঃ ব্যক্তি মিলে গঠিত হয় সমাজ এবং গোটা সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হয় রাষ্ট্র । জাতীয় জীবনে তথা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সার্বিক উন্নতির পূর্বশর্ত হচ্ছে অধ্যবসায় । যে জাতি অলস, কর্মবিমুখ ও উদ্যমহীন, সে জাতি প্রতিযোগিতামুখর পৃথিবীতে পিছিয়ে পড়তে বাধ্য । পৃথিবীতে অনেক জাতি সম্পদের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও শুধুমাত্র অধ্যবসায়ের গুণে জ্ঞানে ও ধনে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে । জাপান, জার্মানি এবং অতি সম্প্রতি মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশ কেবল অধ্যবসায়ের গুণে উন্নতির পথে ধাবিত হয়েছে । প্রকৃত পক্ষে অধ্যবসায়ী জাতি প্রকারান্তরে ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির পথে কার্যকরী অবদান রাখতে সক্ষম হয় ।

অধ্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তঃ জীবন সংগ্রামে সাফল্যের মূলমন্ত্র অধ্যবসায় । ইতিহাসের পাতা উল্টালে এ ধরনের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় । হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), মহাকারুনিক গৌতম বুদ্ধ, যিশু খ্রিষ্ট ও শ্রীকৃষ্ণের সত্য ধর্ম প্রচারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার খবর কে না জানে? স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রম্বস অধ্যবসায়ের জলন্ত দৃষ্টান্ত । মাকড়শার অধ্যবসায়ের দৃষ্টান্ত তাকে উদ্দীপনা যুগিয়েছিল । তাইতো পরপর দুবার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি দেখলেন যে, মাকড়শা তার কড়িকাঠে সূত্র সাপনের চেষ্টার সপ্তমবারে কৃতকার্য হয়েছে । এটা দেখে রাজা শিক্ষালাভ করেন এবং ইংজেরদেরকে সপ্তমবারে পরাজিত করে জয় লাভ করেন । পন্ডেত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসগারের অধ্যবসায়ের কি তুলনা আছে? দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান সুকঠোর সাধনার ফলে উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি সন্তানের সম্মান লাভ করেছিলেন । আমেরিকার আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের জীবনেও নানা বিপত্তি, অপমানজনক কথা আসে কিন্তু তিনি এতে দমে না গিয়ে তার কাজ চালিয়ে যান এবং মাত্র কজন সঙ্গী নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কাঙিক্ষত সানে পৌঁছাতে সক্ষম হন । অর্ধপৃথিবীর অধীশ্বর নেপােলিয়ন বােনাপার্ট তাঁর কর্মের ভিতর দিয়ে রেখে গেছেন অধ্যবসায়ের অপূর্ব নিদর্শন । কোন কাজকেই তিনি অসম্ভব বলে মনে করতেন না । তাই তিনি এক দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ করেও একমাত্র অধ্যবসায়ের মাধ্যমে ফরাসি জাতির ভাগ্য বিধাতা পদে অধিষ্ঠিত হতে সমর্থ হয়েছিলেন । বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্ৰৰসু বহুকাল অধ্যবসায় চালিয়ে উদ্ভিদের চেতনাশক্তি ও স্পন্দন সম্পর্কে তত্ত্ব আবিষ্কার কছছিনে । এছাড়াও আব্রহাম লিংকন, ফ্ৰংকলিন, গ্যলিলিও, বাষ্পীয় যন্ত্রে আবিষ্কারক জেমস ওয়াট, সাহিত্যিক জর্জ বার্নার্ড শ, বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে, লুই পার, মাদামকুরি, আইনস্টাইন প্রমুখ অধ্যবসায়ের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে জীবনে সফলতা অর্জন করেছেন।

অধ্যবসায়হীনতার কুফলঃ জীবন পুষ্পশয্যা নয়। অনেক কষ্ট সহ্য করেম অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আমাদেরকে সুখের স্বর্গ রচনা করতে হয়। জীবনের কোন মহৎ কর্মই ত্যাগ তিতিক্ষা ও দুঃখ কষ্ট ছাড়া সফল হয় না। অধ্যবসায়ের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন অকালে শেষ হয়ে যায়। অধ্যবসায়হীন ব্যক্তি জগতের কোন কাজেই সফলতা অর্জন করতে পারে না। তার জীবন ধ্বংস হয়, ব্যর্থ হয়। তার স্মৃতি হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গর্ভে। অনেক প্রতিভাধর ব্যক্তি শুধু অধ্যসায়ের অভাবে জীবন যুদ্ধে অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।

উপসংহারঃ মহাকালের অনন্ত প্রবাহে মানুষ পায় এক সীমাবদ্ধ জীবন। এই ক্ষণিকের জীবনে মানুষ স্মরণীয়বরণীয় হয়ে ওঠে নিজের কর্ম ফলের মাধ্যমে। যারা সংকল্পে অটল, অধ্যবসায়ী এবং পরিশ্রমী তাদের অসাধ্য । কিছুই নেই । মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন’-এই প্রচলিত আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রেখে যে ব্যক্তি পুনঃপুনঃ চেষ্টার মাধ্যমে জীবনের চলার পথে পা বাড়ায় তার জীবনেই সৌরভমন্ডেত পুষ্প ফোটে । একমাত্র অধ্যবসায়ের গুণেই মানব জীবন হয়ে ওঠে স্মরণীয় ও বরণীয়। তাই খ্যাতির আলােক বর্তিকায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠার জন্য একমাত্র অধ্যবসায়কেই কণ্ঠের হার করে নিতে হবে।

আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনারা যদি কোথাও কোনো ভূল পান তাহলে অনুগ্রহ করে সেখানকার কমেন্ট বক্সে জানিয়ে দিবেন। আমরা যত দ্রুত পারি সেটি সংশোধন করে দিবো। পাশাপাশি আপনার নাম আমাদের 'ধন্যবাদ পেজে' যুক্ত করা হবে। আপনাদের যদি আরো কোনো বাংলা রচনা/অনুচ্ছেদ রচনার প্রয়োজন হয় তবে আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন । আমরা সেটি যুক্ত করার চেষ্টা করব।

Post a Comment

4 Comments Replies Comment


  1. অসাধার, তবে প্যারা আরও বাড়ানো উচিত ছিলো। আর,এখানাকার প্যারা গুলো একটু common ছিলো।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আচ্ছা, আমরা আরো প্যারা লিখে বাড়িয়ে দিবো।

      Delete
  2. অনেক সুন্দর,ধন্যবাদ

    ReplyDelete