SkyIsTheLimit
Bookmark

রচনা রােহিঙ্গা শরণার্থী সংকট ও বাংলাদেশ

রােহিঙ্গা সংকট ও সমাধান
ভূমিকা: বাংলাদেশে রােহিঙ্গা সমস্যা সাম্প্রতিক সময়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সংকট। মিয়ানমারে সরকারি বাহিনীর নিপীড়নের শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসা রােহিঙ্গাদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ আশ্রয় দেয়। বর্তমানে এ দেশে রােহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দশ লক্ষ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই স্রোতের মতাে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এই অসহায় মানুষগুলাে। মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এই বিপুল জনগােষ্ঠীকে আশ্রয় ও পর্যাপ্ত সুযােগ-সুবিধা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আর এই বিপুল জনগােষ্ঠীকে শীঘ্রই ফেরত পাঠানাে সম্ভব না হলে বাংলাদেশ পড়তে পারে এক গভীর সংকটে।
রােহিঙ্গা কারা: রােহিঙ্গা মূলত মিয়ানমারের পশ্চিম অঞ্চলে বসবাসকারী একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। মিয়ানমারের একটি অঙ্গরাজ্য হলাে আরকান। অষ্টম শতাব্দীতে আরবদের আগমনের মধ্য দিয়ে আরকানে মুসলমানদের রাজ্য রােহান বা ‘রােহাঙ' নামে পরিচিত ছিল। সেই। অঞ্চলের অধিবাসীরাই রােহিঙ্গা নামে পরিচিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পাশে উত্তর রাখাইন রাজ্যের (যার পূর্বনাম আরাকান) তিনটি টাউনশিপে বাস করত। এদের অধিকাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। স্থানীয় উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণ এবং মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কর্তৃক জাতিগত নির্মূল অভিযানের শিকার হয়ে প্রায় ১০ লাখের মতাে রােহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় সর্বাধিকসংখ্যক রােহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
রােহিঙ্গা সমস্যা উদ্ভবের কারণ: ২৫ আগস্ট ২০১৭ কথিত সন্ত্রাসী হামলার জবাবে রাখাইনে ভয়ংকর পােড়ামাটি নীতিতে অভিযান চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। অপারেশন ক্লিয়ারেন্স নামক এ অভিযানে রাখাইন সেনা ও মগদের হাতে হাজার হাজার রােহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ২১৪টি গ্রাম। উদ্ভূত এ রােহিঙ্গা সমস্যার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ ও বহু অতীত
১. ব্রিটিশ সমস্যা কর্তৃক সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়া: ১৭৮৪ সালে ব্রিটিশরা আরাকান রাজ্য দখলে নিলে বাংলা ও ভারতের অনেক রাজ্যের সাথে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) যােগাযােগ বেড়ে যায়। ব্রিটিশদের কাছে রােহিঙ্গা মুসলমানরা বেশি গুরুত্ব পায় এবং বিভিন্ন সরকারি পদে আসীন হয়। এ বিষয়টি রাখাইনদের মনে অসন্তোষের জন্ম নেয়।
২. ব্রিটিশদের মিয়ানমার দখলে সহায়তা: ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশরা মিয়ানমার দখল নেয়। আর এতে রােহিঙ্গারা তাদের সাহায্য করে। রােহিঙ্গাদের প্রত্যাশা ছিল মুসলমানদের জন্য আলাদা রাজ্য গঠন করা। এ বিষয়টি রাখাইনরা ভালােভাবে নেয়নি।
৩. পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হওয়ার প্রচেষ্টা: ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের সময় রােহিঙ্গারা তাদের অলকে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা তরে। তাদের এ চেষ্টাকে মিয়ানমারের ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে। মিয়ানমারের রােহিঙ্গা জনগােষ্ঠীর ওপর বৈষম্য ও নিপীড়নের এটিও একটি কারণ।
৪. নে উইনের ক্ষমতা দখল: ১৯৬২ সালে সামরিক শাসক নে উইন মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি রােহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি কঠোর মনােভাব গ্রহণ করেন। রােহিঙ্গাদের পূর্ব স্বীকৃত অধিকার ও সুবিধাসমূহ বানচাল করে দেন। তিনি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বাতিল করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রােহিঙ্গাদের কথা বলার সুযােগটুকু নষ্ট হয়। 
৫. ১৯৪২ সালে রােহিঙ্গা হত্যা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গােড়ার দিকে ১৯৪২ সালে জাপানিরা ব্রিটিশদের কাছ থেকে বার্মা দখল নেয়। রাখাইনরা এ সময় ব্রিটিশদের কাছ থেকে সুবিধাপ্রাপ্ত রােহিঙ্গাদের আক্রমণ করে। এভাবে তারা প্রায় পাঁচ হাজার রােহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করে। 
৬. রােহিঙ্গাদের পাল্টা প্রতিশােধ: এই হত্যায় পাল্টা প্রতিশােধ হিসেবে উত্তর রাখাইন অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার রাখাইনকে হত্যা করে রােহিঙ্গারা। সংঘাত তীব্র হলে জাপানিদের সহায়তায় রাখাইনরা রােহিঙ্গাদের কোণঠাসা করে ফেলে। ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার জাপানিদের দখলে থাকে। এ তিন বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার রােহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলায় চলে আসে। 
রােহিঙ্গাদের প্রতি নানা বৈষম্য: ১৯৬২ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করার পর ধীরে ধীরে রােহিঙ্গাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য বাড়তে থাকে। এসব বৈষম্যের মধ্যে রয়েছে -
১. ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন পাস: ১৫ই অক্টোবর ১৯৮২ সালে মিয়ানমারে যে নাগরিকত্ব আইন পাস হয়। এই আইন অনুসারে মিয়ানমারে পূর্ণাঙ্গ, সহযােগী ও অভিবাসী- এই তিন ধরনের নাগরিকত্বের বিধান রাখা হয়। এই আইনে রােহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট একটি গােত্র হিসেবে অস্বীকার করা হয় এবং তাদের পূর্ব বাংলা থেকে আসা অবৈধ জনগােষ্ঠী হিসেবে দাবি করা হয়। 
২. নাগরিক কার্ড থেকে বঞ্চিত করা:  ১৯৮৯ সাল থেকে মিয়ানমার তিন ধরনের নাগরিক কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গােলাপি, সহযােগী নাগরিকদের জন্য নীল এবং অভিবাসী নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেওয়া হয়। চাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, পড়াশােনা, চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের কাজকর্মে এই কার্ড ব্যবহার করা হয়। কিন্তু রােহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। 
৩. নির্দিষ্ট গ্রামে বন্দি: মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রােহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। আর তাই রােহিঙ্গারা নিজ গ্রামেই বন্দি মানুষের মতাে জীবনযাপন করে। গ্রামের বাইরে যেতে হলে তাদের নাসাকাকে ঘুষ দিয়ে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। 
৪. বিয়েতে বাধা: ১৯৯০ সালে আরকান রাজ্যে একটি স্থানীয় আইন জারি করা হয়। এ আইন অনুযায়ী এ অঞ্চলে বাস করা রােহিঙ্গাদের বিয়ের পূর্বে সরকারি অনুমােদন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। 
৫. জন্মনিয়ন্ত্রণ: দুইটির অধিক সন্তান নেবে না- এমন মুচলেকা দিতে হয় নবদম্পতিকে। 
৬. চিকিৎসা ও শিক্ষায় সীমিত অধিকার: রােহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়ােজনীয় অবকাঠামো অত্যন্ত অপ্রতুল ও নিম্নমানের। স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতালগুলােতে রােহিঙ্গাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা চালু থাকলেও সেখানে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।  
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রােহিঙ্গা সমস্যা: মিয়ানমারে ধারাবাহিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে ১৯৭৮ সাল থেকে রােহিঙ্গারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আসা শুরু করে। ২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটির রাখাইন রাজ্যকে রােহিজ্গামুক্ত করতে যে সামরিক অভিযান শুরু করে তার নামকরণ করা হয় অপারেশন ক্লিয়ারেন্স'। এ অভিযানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের কুখ্যাত যুদ্ধ কৌশল Three All Policy অনুসরণ করে। এ কৌশলের মূল কথা সবাইকে হত্যা করাে, সব কিছু পুড়িয়ে দাও, সব কিছু লুট করাে। এর পর থেকে ঢলের মতাে এ দেশে আসতে থাকে রােহিঙ্গা শরণার্থীরা। বর্তমানে বাংলাদেশে রােহিজ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক। যা রােহিঙ্গাদের মূল বাসভূমি রাখাইনের চেয়েও বেশি  অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতার আলােকে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে মিয়ানমারের বিতাড়িত রােহিঙ্গাদের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হলে নানা সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যেমন- 
১. জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাবে: বাংলাদেশ এমনিতেই জনবহুল দেশ। তার ওপর এই বিপুলসংখ্যক রােহিঙ্গারা এ দেশে আগমন স্বাভাবিকভাবেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর চাপ 
২. অর্থনৈতিক সংকট বৃদ্ধি: এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চাহিদা পূরণ করার মতাে আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। এ দেশে তাদের অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনৈতিক সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করে। 
৩. দেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাবে:  রােহিঙ্গা জনগােষ্ঠী এ দেশে তাদের সার্বিক চাহিদার পূরণ করতে গিয়ে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপেও যুক্ত হতে পারে। ইতিমধ্যেই তারা এ দেশের স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। 
৪. মাদক ও চোরাচালানের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে: পত্রপত্রিকায় প্রায়ই রােহিঙ্গাদের মাদক চোরাচালানের অপরাধে গ্রেপ্তার হতে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি এই ভয়ংকর পেশায় জড়িয়ে পড়ে তাহলে আমাদের এই সােনার বাংলার সর্বত্র অশান্তি বিরাজ করবে, যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।
৫. সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে: এই বিপুলসংখ্যক মানুষের দেখাশােনার জন্য যে জনবল দরকার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা কষ্টকর। ফলে তারা সহজেই বিভিন্ন আইন পরিপন্থী। কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর এর ফলে এ দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। 
উপসংহার: রােহিঙ্গা সমস্যার সাথে বাংলাদেশ কোনােভাবেই যুক্ত হতে পারে না। ইতিমধ্যে যে বিপুলসংখ্যক রােহিঙ্গা এ দেশে অনুপ্রবেশ করেছে তাদের ফেরত পাঠানাের ব্যাপারে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে হবে এবং নিজ জন্মভূমিতে যাতে নাগরিক হিসেবে রােহিঙ্গারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়, যে বিষয়ে নিতে হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ।

লেখা-লেখি করতে ভালোবাসেন? লেখালেখির মাধ্যমে উপার্জন করতে যুক্ত হতে পারেন আমাদের সাথে Telegram এ!
1 comment

1 comment

  • Anonymous
    Anonymous
    09 January, 2024
    you guys shuld launch an app
    Reply