SkyIsTheLimit
Bookmark

রচনা যুব সমাজ ও তথ্যপ্রযুক্তি

ভূমিকা: আজকের যুবকরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। যুবসমাজই পারে শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে দেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর 'আঠারাে বছর বয়স কবিতায় বলেছেন - 
'পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে, 
এদেশের বুকে আঠারাে আসুক নেমে।' 
তথ্য প্রযুক্তি যুব সমাজের নিকট সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় মাধ্যম। সমাজ পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুব সমাজকে কাজে লাগানাের জন্য এই জনপ্রিয় ও আকর্ষনীয় মাধ্যমকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই তথ্যপ্রযুক্তি থেকে তারা সহজে প্রয়ােজনীয় তথ্য পেতে পারে এবং এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা তাদের শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তাই শিক্ষার্থী ও কর্মহীন যুবকদের উভয়ের জন্য তথ্য প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সামগ্রী সহজলভ্য করে দিতে হবে। কারণ এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যেমনি নতুন নতুন কাজের ধারা তারা খুঁজে পাবে, তেমনি বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের যুব সমাজের সাথে যােগাযােগ স্থাপন করতে পারবে। যা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভান্ডারকে ব্যাপকতা দান করবে এবং সমৃদ্ধ করবে। 
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশের ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। শুরুর দিকে ধারণা করা হতাে স্বয়ংক্রিয়করণ এবং প্রযুক্তির প্রয়ােগের ফলে বিশ্বব্যাপি কাজের পরিমাণ কমে যাবে এবং বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাবে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে কিছু কিছু সনাতনী কাজ বিলুপ্ত হয়েছে বা বেশ কিছু কাজের ধারা পরিবর্তন হয়েছে বটে, তবে অসংখ্য নতুন কাজের সুযােগ সৃষ্টি হয়েছে। আর তাতে লাভবান হয়েছে বেকার যুবকরাই । গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেট সংযোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে কর্মসংস্থানের সুযােগও দ্রুতহারে বেড়ে গেছে। তথ্য ও যােগাযােগ প্রযুক্তির প্রয়ােগের ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে যা বাঙালি শিক্ষাবিদ ও বর্তমানে আমেরিকার ম্যাসাচুস্টেস ইনস্টিটিউট অব টেকনােলজির (MIT) অধ্যাপক ড.ইকবাল কাদির এর মতে "সংযুক্তিই উৎপাদনশীলতা" অর্থাৎ প্রযুক্তিতে জনগণের সংযুক্তি বাড়লে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ফলে তৈরী হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থান । 
যুব সমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি: তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে একজন কর্মী অনেক বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে, অনেক প্রতিষ্ঠানই স্বল্প কর্মী দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নিতে পারে বিভিন্ন কারখানার বিপজ্জনক কাজগুলাে মানুষের পরিবর্তে রােবট কিংবা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যেতে পারে। কর্মস্থলে কর্মীদের উপস্থিতির সময়কাল, তাদের বেতন ভাতাদি ইত্যাদি হিসাব করার জন্য বেশ কিছু কর্মীর প্রয়ােজন হয়। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় উপস্থিতি যন্ত্র, বেতন-ভাতাদি হিসাবের সফটওয়ার ইত্যাদির ব্যবহারের মাধ্যমে এ সকল কাজ সম্পন্ন করা যায়। বিভিন্ন গুদামে মালামাল সুসজ্জিত করার কাজ স্বয়ংক্রিয় ভাবে করা যায়। টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে পৃথক জনবলের প্রয়ােজন হয় না।স্বয়ংক্রিয় ইন্টারেকটিভ ভয়েস প্রযুক্তি ব্যবহার করে দিন-রাত যেকোন সময় গ্রাহকের নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায়। ব্যাংকের এটিএম এর মাধ্যমে যেকোন সময় নগদ অর্থ তােলা যায়। অন্যদিকে আইসিটির কারণে অনেক কাজের ধরন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য নিজেকে ক্রমাগত দক্ষ করে তুলতে হয়। ফলে দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচিতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। 
ঘরে বসে কাজ করার সুযােগ: যুব সমাজ কম্পিউটারের সাহায্যে অনেক ধরনের কাজ এখন ঘরে বসেই করতে পারছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পূর্বে বিশেষ দক্ষতা না থাকলে যে কাজ সম্পন্ন করা যেত না, এরূপ অনেক কাজ কম্পিউটারের সহায়তায় সহজে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। যেমন ফটোগ্রাফি বা ভিডিও এডিটিং অনেকে ঘরে বসে কাজ করছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন ভার্চুয়াল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানে সহায়ক কর্মীর সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি তাদের কাজের ধরনও পাল্টে গেছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হওয়াতে কর্মীদের কাজে ফাকি দেওয়ার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও যুবকদের কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণ: তথ্যপ্রযুক্তির সবচেয়ে বড় প্রণােদনা হলাে এর মাধ্যমে নিত্যনতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়। ফলে অনেক বেশি কাজের সুযােগ তৈরি হয়। শুধু কর্মসৃজন নয়, কর্মপ্রত্যাশীদের কাজের সুযােগ প্রাপ্তিতেও ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির বড় ভূমিকা রয়েছে। আইসিটি বিকাশের ফলে বর্তমানে ইন্টানেটে ‘জবসাইট নামে নতুন এক ধরনের সেবা চালু হয়েছে। এই সকল জবসাইটে নিয়ােগকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি তাদের বিজ্ঞপ্তি প্রচার করতে পারে। শুধু তাই নয়, নিয়ােগকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুকের মতাে সামাজিক যােগাযােগ সাইটেও বিনামূল্যে নিয়ােগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে। ফলে কর্মপ্রত্যাশীদের একটি বিরাট অংশ বিষয়টি সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে অবগত হতে পারেন। এছাড়া এরূপ কোনাে কোনাে সাইটে কর্মপ্রত্যাশীগণ নিজেদের নিবন্ধিত করে রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে, যেকোন নতুন কাজের খবর প্রকাশিত হওয়ামাত্রই নিবন্ধিত ব্যক্তি ই-মেইল বা এসএমএস এর মাধ্যমে এ সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন।
তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার: তথ্যপ্রযুক্তির সহজবােধ্যতা যুবসমাজকে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বেড়ে যাচ্ছে যুব সমাজের অবক্ষয়। পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টিভি, ইনটারনেট, ফেসবুকসহ নানা ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার অনস্বীকার্য। সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যবহৃত টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঘরে বসে দুত সময়ে পৃথিবীর যে কোনাে খবর জানা ও আপনজনের সঙ্গে যােগাযােগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত টিভি ও ইন্টারনেটও প্রযুক্তির অবদান। প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজতর করাসহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দুর্ভাগ্যবশত এটির অপব্যবহার কিশাের ও যুবসমাজকে অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত করছে। 
যুবসমাজের উপর তথ্যপ্রযুক্তির কুপ্রভাব: তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে যুবসমাজের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনসহ কিছু মনস্তাত্ত্বিক এবং আচরণগত পরিবর্তন অবধারিত। বাংলাদেশের মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের ২০১৫ সালের একটি জরিপ উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরা যেতে পারে। জরিপে দেখানাে হয়েছে, ঢাকার একটি স্কুলে মােট ৩০ জন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্লাসরুমে বসে পর্ণগ্রাফি দেখে এরকম ২৫ জনের মােবাইলে পর্ণগ্রাফি পাওয়া যায়। অপরদিকে, ১০০ জন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীর ৮৬ জন মােবাইল ব্যবহার করে যাদের মধ্যে ৭৬ জন পর্ণগ্রাফি দেখে। ফলে তাদের আসক্তির মাত্রা বেড়ে চলছে পাশাপাশি লেখাপড়ায় অমনােযােগীর সংখ্যাও লক্ষণীয়। কিছু বিকৃত রুচিহীন বিনােদনমূলক অনুষ্ঠান, মিউজিক ভিডিও, পর্ণগ্রাফি কিশাের ও যুবকদের খারাপ কাজে উদ্দীপনা তৈরির পাশাপাশি অনুকরণে উৎসাহ দেয়। ফলে বড় বড় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি যুবসমাজ বিপদগামী হওয়ার কারণ হিসেবে আমেরিকান কয়েকজন গবেষক প্রযুক্তির অপব্যবহারকে দায়ী করেছেন। কারণ, প্রযুক্তির এ অপব্যবহার তাদের ব্র্যান্ড, ইমেজ, ও গ্লামারের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি করে। ফলে এটির অনুকরণে যুবসমাজ ভালমন্দের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে না। মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজ ও স্মার্ট করার পেছনে ইন্টারনেট, ইউটিউব, ভাইবার, ফেসবুকসহ প্রযুক্তির আরাে অনেক মাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও এর আবার বিপরীত ভূমিকাও লক্ষ্য করা যায়। যা যুবসমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইন্টারনেট, ইউটিউব, ভাইবার, পর্ণগ্রাফি আসক্তিতে উন্নত দেশগুলাের প্রায় ৬২% যুবসমাজ (১২- ১৬ বছর) যৌন হয়রানি ও ধর্ষণসহ বড় বড় অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। যা যুবসমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ এমনকি পর্ণ আসক্তিতে প্রতি বছর আমেরিকার স্কুল পড়ুয়া ২,৮০,০০০ শিক্ষার্থী গর্ভবতী হচ্ছে যা শুধু পরিবার নয় তথা পুরাে সমাজ ও একটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। (সূত্র: ন্যাশনাল ক্রাইম প্রিভেনশন সার্ভে) 
উপসংহার: তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আবার আমাদের কাছ থেকে নৈতিকতা ও মূল্যবােধে কেড়ে নিয়েছে। এ কথা সমীচীন নয় যে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সমাজের জন্য অপ্রয়ােজনীয়। সভ্যতার উন্নয়নে তথ্য প্রযুক্তির অবদান অপূরণীয়। কিন্তু আমাদের এ কথাও অনুধাবন করতে হবে যে প্রযুক্তির অকল্যাণকর দিকগুলাে আমাদের অবস্থান কোথায় নামিয়ে দিচ্ছে। অবশ্য এর জন্য আবিষ্কার ও আবিষ্কারক কোনােটিই অপরাধী নয়, অপরাধী হচ্ছি আমরা ব্যবহারকারীরা। তাই এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে । তবেই যুবসমাজ প্রযুক্তির যথাযথ কল্যাণ লাভ করতে সক্ষম হবে।

লেখা-লেখি করতে ভালোবাসেন? লেখালেখির মাধ্যমে উপার্জন করতে যুক্ত হতে পারেন আমাদের সাথে Telegram এ!
Post a Comment

Post a Comment