SkyIsTheLimit
Bookmark

রচনা বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা ও এর প্রতিকার

ভূমিকা :
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। স্বাধীন দেশ হিসেবে এ দেশের জন্মের ইতিহাস দীর্ঘদিনের না হলেও সামাজিক অবস্থান দীর্ঘকালের। প্রায় দুশ বছর ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে এ দেশ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের কবলে। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর এ দেশ প্রায় সিকি শতাব্দী পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সামন্তবাদী শাসকগােষ্ঠীর হাতে ঔপনিবেশিক ধরনের শাসনের অধীনে ছিল। ফলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ঔপনিবেশিক ও সামন্তবাদী শাসনের প্রভাবে গড়ে উঠেছে । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ দেশ সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারে নি । ফলে সমাজ জীবনে রয়ে গেছে নানা সমস্যা। এসব সমস্যা বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পথে অন্তরায় হয়ে রয়েছে।
জনসংখ্যা সমস্যা : বাংলাদেশ একটি জনবহুল দরিদ্র দেশ। এ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। প্রতি মিনিটে এ দেশে ৪টি শিশু জন্মগ্রহণ করে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ একেবারেই কম। প্রতি একরে খাদ্য উৎপাদনও কম। ফলে বিশাল জনগােষ্ঠী ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের শিকার। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় কুসংস্কার, নারীশিক্ষার অভাব ইত্যাদি কারণে জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। ফলে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ একদিকে যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে তেমনি সামাজিক সমস্যারও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেকার সমস্যা : বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় শিল্পায়নের গতি অত্যন্ত মন্থর। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে যা অপ্রতুল। ফলে বেকার সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। একসময় কৃষিকাজ, কুটিরশিল্প ও তাঁতশিল্পে অধিকাংশ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হতা। কিন্তু সুদীর্ঘকালের ঔপনিবেশিক শাসন গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। দেশ বিভাগের পর যতটুকু শিল্পবিকাশ ঘটেছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ধ্বংসলীলায় তাও হয়ে পড়ে পঙ্গু। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মৃতপ্রায় অর্থনীতিতে বেকারত্ব মারাত্মক রূপ নেয়। সাম্প্রতিককালে মুক্ত বাজার অর্থনীতি দেশীয় শিল্পবিকাশের পথে বিরাট বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেশে উপযুক্ত শিক্ষার অভাবেও বেকারত্ব প্রকৃট আকার নিচ্ছে। এককথায়, বেকারত্ব জাতির সামনে এক ভয়াবহ অভিশাপ হিসেবে বিদ্যমান। যা সামাজিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত করছে এবং ব্যাপক সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।
সামাজিক অবক্ষয় ও সন্ত্রাস : কর্মসংস্থানের অভাবে শিক্ষিত তরুণ সমাজসহ বস্তিবাসী তরুণ ও কিশােররা বিকল্প রাস্তা হিসেবে অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছে। ফলে সমাজে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, জুয়া, যৌন অপরাধ, মাদকাসক্তি, কালােবাজারি, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে। ড্রাগ বা মাদক দ্রব্যের নীল ছােবলে দেশের তারুণ্যের একটা বড় অংশ আজ ধ্বংসের মুখে। নেশা কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকাসক্তির পাশাপাশি সমাজে সন্ত্রাসও বেড়ে চলছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া পেয়ে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য এত বেড়েছে যে, দেশের রাজনীতিও বহুলাংশে পেশিশক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। 
যৌতুক প্রথা ও নারী নির্যাতন : যৌতুক প্রথা এখন বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যাসমূহের মধ্যে অন্যতম সমস্যা। এটি নারী নির্যাতনের বড় একটি কারণ। বাংলাদেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি যৌতুক প্রথার প্রসারে সাহায্য করছে। দারিদ্র্যের চাপে পড়ে অনেকে যৌতুক গ্রহণ করে। এ যৌতুকের বলি অগণিত গৃহবধূ। এ যাবৎ যেসব গৃহবধূ ও কুমারী আত্মহত্যা করেছে। তার শতকরা ৯০ ভাগ যৌতুকের কারণে। এটি সমাজের দৈন্যদশার কলঙ্কময় অধ্যায় রচনা করছে। যৌতুকের জন্যে সমাজে নারী নির্যাতন বেড়ে চলেছে। সে সঙ্গে অপসংস্কৃতির প্রভাবে এবং পরিভােগপ্রবণ মানসিকতার উৎকট ফল হিসেবে সমাজে নারীর প্রতি নির্মম নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণ করে নারীকে বস্তাবন্দি লাশ হিসেবে ফেলে রাখা কিংবা বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হলে এসিড নিক্ষেপের মতাে পাশবিক ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এসব ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ । 
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস : শিক্ষাঙ্গনের মতাে পবিত্র জায়গায় সন্ত্রাস, আমাদের সামাজিক সমস্যার এক নগ্নরূপ প্রকাশ করে। গােলাগুলি, বােমাবাজি এখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। তথাকথিত রাজনীতির ছত্রছায়ায় শিক্ষাঙ্গন হয়ে পড়েছে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি। ফলে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সেশনজট বাড়ছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা রাজনীতি সচেতন হওয়ার পরিবর্তে হয়ে পড়ছে রাজনীতিবিমুখ। বিপথগামী ছাত্রসমাজ সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির চর্চায় লিপ্ত হচ্ছে। সার্বিকভাবে নৈতিকতা ও সুস্থ মানসিকতার অপমৃত্যু ঘটছে। শিক্ষাঙ্গনে সৃষ্ট সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সমাজ ধীরে ধীরে ডুবে চলেছে অন্ধকারের আবর্ত।
সামাজিক দুর্নীতি : বাংলাদেশে যেসব সামাজিক সমস্যা রয়েছে তার মধ্যে দুর্নীতি সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ এ ব্যাধি মানসিক এবং তা সারানাে খুব সহজ নয়। বাংলাদেশ সীমাহীন দুর্নীতির আবর্তে নিমজ্জিত এবং দুনীতি রয়েছে প্রায় সর্বত্র। দুর্নীতির অপপ্রতিযােগিতায় ইতােমধ্যে বাংলাদেশ হ্যাট্রিক করেছে। এতে করে বিশ্বের বিভিন্ন দাতাদেশ ও দাতাগােষ্ঠীর কাছ থেকে সাহায্য সহানুভূতি পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ঋণ নিয়ে বেমালুম হজম করে ফেলা, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করা, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস চুরি, আয়কর-স্ক্রিয়কর-শুল্ক ফাঁকি দেয়া, চাকরির নামে হায় হায় কোম্পানি খােলা দুর্নীতি কোথায় নেই? এমনকী দুস্থ মানুষের গম নিয়ে, এতিমখানার এতিমদের বস্ত্র নিয়েও দুনীতি হচ্ছে। পরীক্ষার হলেও দুর্নীতি আধিপত্য বিস্তার করছে। ভাবা যায় না, মেধা তালিকায় স্থান নির্ধারণেও চলে দুনীতি। সরকার দুর্নীতি দমন ব্যুরাে গঠন করেছে দুর্নীতি সামাল দিতে। কিন্তু দুর্নীতির ভূত সেখানেও রয়ে গেছে । অসহায় মানুষ যেখানে ন্যায়বিচার আশা করে, সেই বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি আইনের শাসনের হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক রূপান্তর ছাড়া এ দুর্নীতির ঘুণ থেকে আমাদের রেহাই নেই। 
কিশাের অপরাধ : নানা কারণে উঠতি প্রজন্মের ওপর পরিবার ও সমাজের নিয়ন্ত্রণ হয়ে পড়েছে শিথিল। ফলে নবীন প্রজন্মের একটা অংশ অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সমাজে কিশাের অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে।
ভিক্ষাবৃত্তি : ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের সমাজে আর একটি বড় সমস্যা। ভিক্ষুকরা পরশ্রমজীবী। তারা পরগাছার মতাে সমাজে বাড়ছে এবং সমাজের সুস্থ বিকাশকে বিঘ্নিত করছে। শারীরিক অক্ষমতা নেই কিংবা দারিদ্র্যপীড়িত নয়  এমন বহু লােক প্রতারণামূলকভাবে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। 
নিরক্ষরতা : অদ্যাবধি আমাদের দেশের অধিকাংশ লােকই নিরক্ষর রয়ে গেছে। ফলে জাতীয় অগ্রগতিতে এরা তেমন কোনাে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারছে না। নিরক্ষরতা বেকারত্বকে আরও প্রকট করছে। এ দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটকে পরিবর্তন করতে হলে, জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হলে, অবশ্যই শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষার হার বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। নিরক্ষরতার কারণেই বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ হিসেবে বিরাট গ্লানি বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা। 
দারিদ্র : শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ– জীবনযাত্রার মানের সব দিকেই আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এ পশ্চাৎপদতার কারণ ঐতিহাসিক। প্রথমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানি শাসন এ দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এ দেশের কোটি কোটি মানুষ বেকার ও সম্পদহীন হয়ে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়ে। শিল্পে অনগ্রসর, মান্ধাতার আমলের কৃষিব্যবস্থা-নির্ভর জনসংখ্যাবহুল বাংলাদেশে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন সহজ ব্যাপার নয়। জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে খাদ্যঘাটতি পূরণের জন্যে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে প্রচুর খাদ্য আমদানি করতে হয়। এসব কারণে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নয়নও সম্ভব হয় নি। এদিকে যে পরিমাণ বেকার তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এ দেশে সম্ভব হচ্ছে। না। ফলে দারিদ্র্য প্রকট হয়ে উঠছে। 
সামাজিক সমস্যার প্রতিকার: 
  • জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ 
  • কর্মসংস্থানের সৃষ্টি 
  • মৌল মানবিক অধিকার নিশ্চিতকরণ; 
  • সম্পদের সুষম বণ্টন 
  • শিক্ষার হার বৃদ্ধি 
  • দ্রব্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ 
  • দেশীয় সংস্কৃতির অনুশীলন 
  • চিত্তবিনােদনের ব্যবস্থা করা 
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অ্যানায়ন।
উপসংহার : নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের দেশ এখন বিশ্বের দরবারে অনুন্নত একটা দেশ, হিসেবে পরিচিত। অথচ এ দেশে সম্পদ রয়েছে, জনশক্তি রয়েছে, মেধা রয়েছে, রয়েছে প্রতিভা। নিজেদের সচেতনতা এবং সরকারের বাস্তবমুখী-সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি পারে দেশের সমস্যা সমাধানকল্পে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে। উপরিউক্ত সমস্যাগুলাের গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশের সার্বিক স্বার্থে সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সুশীল সমাজকে একযােগে কাজ করতে হবে।

লেখা-লেখি করতে ভালোবাসেন? লেখালেখির মাধ্যমে উপার্জন করতে যুক্ত হতে পারেন আমাদের সাথে Telegram এ!
Post a Comment

Post a Comment